ইউপি প্রশাসক সেলিম রেজার বিরুদ্ধে ঘুষ-দুর্নীতির বিস্তর অভিযোগ

সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধিঃ সাভার উপজেলার ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক ও উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের কর্মকর্তা সেলিম রেজার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, নাগরিক সেবা দিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালচক্রের মাধ্যমে কাজ করানো এবং পরিষদের আর্থিক কার্যক্রমে অনিয়মের বিস্তর অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে মূল কর্মস্থলে নিয়মিত দায়িত্ব পালন না করা, বদলি ঠেকানো ও পছন্দের কর্মস্থলে যেতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছেন স্থানীয় সেবাগ্রহীতা ও সচেতন মহল।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, প্রায় এক মাস আগে সেলিম রেজা বনগাঁও ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসকের দায়িত্ব থেকে ইয়ারপুরে বদলি হন। এর আগে তিনি দীর্ঘ পাঁচ-ছয় বছর ধরে সাভারে কর্মরত। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার তাঁকে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও তদবিরের মাধ্যমে সেসব আদেশ প্রত্যাহার করে আবার সাভারে ফেরার অভিযোগ রয়েছে। বনগাঁও ইউনিয়নের প্রশাসকের দায়িত্ব পালনকালেও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ ওঠেছে। ইয়ারপুরে বদলি হওয়ার ক্ষেত্রেও প্রায় ২০ লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের দাবি, সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলকে ম্যানেজ করে তিনি শিল্প কারখানাবহুল ইয়ারপুরে দায়িত্ব নিয়েছেন। বনগাঁওয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান কম থাকায় সেখানে অবৈধ আয়ের সুযোগ তুলনামূলক কম ছিল।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, সম্প্রতি ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদে তাঁর অফিসকক্ষে ঘুষের টাকা গণনার একটি ছবি ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় ব্যাপক আলোচনা হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার চেয়ে বিভিন্নভাবে অর্থ আদায়ের দিকেই বেশি মনোযোগ তাঁর। অন্যদিকে সাভার উপজেলা পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক তাঁর নির্ধারিত কর্মস্থল হলেও সেখানে নিয়মিত উপস্থিত থাকেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, সপ্তাহে এক দিনও ঠিকমতো অফিস না করায় ব্যাংকের সেবাগ্রহীতারা ভোগান্তিতে পড়ছেন। একই সঙ্গে ইউনিয়ন পরিষদেও নাগরিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। এছাড়াও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় সেলিম রেজা আওয়ামী লীগের সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন। জুলাই-পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর থানায় মামলা হওয়ার কথাও অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রিজাইডিং অফিসারের দায়িত্ব পালনের সময় সহকর্মীদের সম্মানীর টাকা কম দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এ নিয়ে সহকর্মীরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে অভিযোগ করলে সেখানেও তাঁকে ভৎসনার মুখে পড়তে হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। এ ছাড়া অধীনস্থ নাইটগার্ডদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগে একপর্যায়ে এক নাইটগার্ড তাঁকে মারধর করেন। সেলিম রেজার বিরুদ্ধে তাঁর অফিসের ঝাড়ুদারের বেতন থেকেও টাকা আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঝাড়ুদারের নির্ধারিত ১ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে তাঁকে ৫০০ টাকা দিয়ে বাকি ১ হাজার টাকা নেওয়া হতো। অডিটে বিষয়টি ধরা পড়ার পর তিনি ভৎসিত হন।

ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদে নাগরিক সেবা পেতে কথিত দালালচক্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয় বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সেবাগ্রহীতা। প্রশাসকের কার্যালয়ের বাইরে দালালদের অবস্থান এবং তাঁদের মাধ্যমে নাগরিক সনদ, ওয়ারিশ সনদ, জন্ম-মৃত্যু নিবন্ধন, ট্রেড লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সেবা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা না দিলে সেবা পেতে বিলম্ব ও হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব কাজে তাকে সহযোগীতা করে থাকে তার ভাগিনা কৌশিক। পরিষদের আয়-ব্যয়, সরকারি বরাদ্দ, প্রকল্পের অর্থ এবং অন্যান্য আর্থিক কার্যক্রমেও স্বচ্ছতার ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, ব্যাংক হিসাব, ভাউচার, প্রকল্পের নথি ও অন্যান্য আর্থিক কাগজপত্র পরীক্ষা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।

আন্দোলনে ভূমিকা ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগ

অভিযোগকারীদের দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় একাধিকবার বদলির আদেশ হলেও প্রভাব খাটিয়ে সাভারে অবস্থান ধরে রাখেন সেলিম রেজা। বর্তমানেও উপজেলা প্রশাসনের একজন প্রভাবশালী কর্মকর্তার বিশেষ আস্থাভাজন হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগের পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে না বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। এমনকি বিভিন্ন পর্যায়ে মোটা অঙ্কের মাসোহারার বিনিময়ে অনিয়ম চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
পরিষদের বিভিন্ন কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তাঁদের মতে, প্রশাসকের বদলি, পরিষদের আয়-ব্যয়, সরকারি বরাদ্দ, ব্যাংক হিসাব, ভাউচার, প্রকল্পের কাগজপত্র এবং নাগরিক সেবা প্রদানের রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে ইয়ারপুর ইউনিয়ন পরিষদের প্রশাসক সেলিম রেজার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘পরে কথা বলব।’ এর বেশি কোনো বক্তব্য তিনি দিতে চাননি। গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে তিনি ক্ষুব্ধ ও অশালীন আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উত্থাপিত বিষয়ে তিনি কোনো নথি বা হিসাব দেখাতে পারেননি।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসনের স্থানীয় সরকার শাখার উপপরিচালক যাবের মোঃ শোয়াইব বলেন, বিষয়টি তদন্তাধীন। সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

  • Related Posts

    আশুলিয়ায় বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে শ্রমিকদের অবস্থান কর্মসূচী

    সাভার (ঢাকা) প্রতিনিধি: সাভারের আশুলিয়ায় ক্লথিং কার্নিভালস লিমিটেড নামক একটি পোশাক কারখানার শ্রমিকরা তিন মাসের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের দাবিতে কারখানার সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। এসময় কারখানাটির ভুক্তভোগী শ্রমিকদের সাথে…

    সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ ২৫ কোটি টাকা করা হচ্ছে-তথ্য প্রতিমন্ত্রী

    জামালপুর প্রতিনিধিঃ প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী বলেছেন সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের বরাদ্দ ৬ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ২৫ কোটি টাকায় উন্নীত করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ইতিমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ে…

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *